বাবা বুদান ও সাতটি কফির দানা

বাবা বুদান ছিলেন অধুনা কর্ণাটকের একজন সুফি সাধক। ‘সুফি’ বলতে আমরা সাধারণত ইহজগত-বিচ্ছিন্ন সাধু বা ফকিরকে বুঝি। দ্বাদশ শতাব্দীতে স্পেনের ইবনে আরাবি সুফি মতকে দার্শনিকভাবে সংহত করেন। ইবনে আরাবির মতবাদটির নাম সুফিস্টিক প্যানথেয়িজম বা প্যান্থেইস্টিক সুফিজম। সৃষ্টি ও স্রষ্টার অভিন্নতা প্রতিপাদন এই মতের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। বাবা বুদান ছিলেন ষোড়শ শতকের সুফি, যাঁকে হিন্দু ও মুসলমান সব সম্প্রদায়ের মানুষ মান্য করতেন। 

বাবা বুদানের সমাধি রয়েছে বুদানগিরিতে, যেটি কর্ণাটকের চিকমাগালুরে অবস্থিত। চিকমাগালুর বললেই ছেলেবেলায় দেখা দেওয়াল লিখন মনে পড়ে যায়—
রায়বেরিলি ভুল করেছে চিকমাগালুর করেনি।
সিপিএম তুমি জেনে রেখো, ইন্দিরা গান্ধী মরেনি।।
সে বার ইন্দিরা গান্ধী রায়বেরিলিতে ভোটে হেরেছিলেন। পরে উপনির্বাচনে চিকমাগালুর কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন।

মক্কায় হজ সেরে সুফি সাধক বাবা বুদান ইয়েমেনের মোচা বন্দর থেকে যখন ফিরছেন তখন তিনি সাতটি কফির দানা দাড়ির ফাঁকে লুকিয়ে এনেছিলেন। কারণ সে সময় অন্য দেশে যে কফি রপ্তানি করা হত, তা ছিল ভাজা অথবা সেঁকা, যা থেকে কফির গাছ হওয়া সম্ভব নয়। তাপে কফি বীজের কূর্বদ্রুপকতা নষ্ট হয়ে যায়। ইয়েমেনিরা কফি ব্যবসায় তাদের একচেটিয়া বাজার ধরে রাখার উদ্দেশে এমন ব্যবস্থা করেছিল। মোচা বন্দরে কফি বীজ আনলেই ধরা হত, তাই বাবা বুদান তাঁর নুরের মধ্যে লুকিয়ে এনেছিলেন কফি বীজ। হ্যাঁ, সাতটি—কারণ সাত সংখ্যা ইসলামে পবিত্র—সাত আসমান তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। ইসলামে অবশ্য ‘সাত’ মানে বহু। সে নিয়ে অনেক কথা আছে।

সেমীয় পুরাণ বলে, প্রথম মানব এসেছিলেন ভারতে, প্রথম মানবী আরব দেশে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের আবির্ভাব আবিসিনিয়ায়, যাকে হাবশিদের দেশ বলা হয়। এই দেশই মানব জাতিকে কফি উপহার দিয়েছিল। হাবশিদের দেশের পাশেই ছিল মরক্কো আর সাগরের অন্য তীরে ইয়েমেন। ইয়েমেনে সেই কফি নিয়ে গিয়েছিলেন আর এক সুফি সাধক, তাঁর নাম-- আকবর নুরুদ্দিন আবু অল-হাসান আল শাদিলি। আকবর নুরুদ্দিন আতুর মানুষদের সেবা করতেন। হাবশিদের দেশে ঘুরতে ঘুরতে একদিন তাঁর নজরে পড়লো, একটি গাছের ফল খেয়ে পাখিদের মধ্যে খুব ফূর্তি হচ্ছে। তিনি নিজেও খেয়ে দেখলেন অপূর্ব সেই বীজ! দারুন আমোদ হচ্ছে অনুভব করলেন। কফির বীজ সঙ্গে নিয়ে এলেন ইয়েমেনে। সারা রাত জেগে যে সব ইসলামি সাধকরা জিকর করতেন তাঁরা খেয়ে দেখলেন সেই মৃদু সুরা যা খিদেকে দূরে রাখে, সেই সঙ্গে নিদ্রাকেও। বিপুল জনপ্রিয় হল ‘কাহওয়া’, যা কফির আরবি শব্দ। তুর্কি ভাষায় কাহওয়া হয়ে গেল ‘কহওয়ে’। কহওয়ে-কে ওলন্দাজরা বললেন ‘কোফি’। কখনও তাকে ধর্মগুরুরা নিষিদ্ধ করেছেন, আবার কখনও পান করার নির্দেশও দিয়েছেন। 

বুদানগিরিতে বাবা বুদানের সমাধি থাকলেও আর একজন পূর্বসূরির নাম করতেই হয়, তিনি আবদুল আজিজ মক্কি, যিনি দাদা হায়াত নামে খ্যাত। একাদশ শতকের সেই সাধকের সঙ্গেও এই গিরির নাম জড়িয়ে আছে। 'গিরি' মানে পর্বত। সেই গিরিতে যাঁর নিবাস তিনি গিরিশ বা শিব।

সমস্যা দেখা দিল। দত্তাত্রেয়বাদীরা বললেন, এই গিরি বাবা শিবের নিবাস। কেউ কেউ জানালেন, বাবা বুদান আসলে দত্তাত্রেয়-র অবতার। অত্রিপুত্র দত্তকে দত্তাত্রেয় বলা হয়। অত্রি ঋগ্বেদের ঋষি, তিনি ব্রহ্মার দশ পুত্রের একজন। বিষ্ণু অংশে দত্ত, রুদ্রাংশে দুর্বাসা ও ব্রহ্মাংশে সোম তাঁর পুত্র।  মনু অবশ্য বলেছেন, দত্তাত্রেয় বা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর রূপী দত্তাত্রেয় আসলে দৈত্য ও দানবদের পিতৃগণ। (মনু ১:৩৪, ৩৫; ৩.১৯৬)।

বাবা বুদানগিরি নাকি গুরু দত্তাত্রেয়-পীঠ তা নিয়ে চলল তুমুল বিতর্ক। এতটাই সেই সংঘাত যে এই জায়গাটিকে ‘কর্ণাটকের অযোধ্যা’ বলে কেউ কেউ চিহ্নিত করলেন। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে বলা হল, the shrine was revered equally by Hindus and Muslims and ordered the status quo to be maintained. সেই সঙ্গে বুদানগিরির ওয়াকফ মর্যাদাকে বাতিল করা হল এবং সেটিকে রাজ্যের ধর্মীয় অর্পণ বিভাগের সম্পদ বলে ঘোষণা করা হল। 

নিদ্রাহর ও ক্ষুধাহর কফির আলোচনায় ফিরে যাই। বিশ্বে সর্বপ্রথম কফি হাউস তৈরি হয় তুরস্কের কনস্টান্টিনোপলে, ১৪৭৫ খ্রিষ্টাব্দে। কফিকে কখনও ধর্মগুরুরা হালাল, কখনও নিষিদ্ধ বলেছেন। ১৫১১ সালে মক্কার তুর্কি গভর্নর খায়ের বেগ কফিকে হারাম ঘোষণা করেন। তাঁর ধারণা ছিল, কফির আড্ডায় বিভিন্ন আলাপে জনগণের অসন্তোষ জেগে উঠবে এবং তাঁর পতন ঘটবে। অবশ্য ১৫২৪ সালে ওসমানি সুলতান প্রথম সেলিম কফিকে হালাল ঘোষণা করেন এবং খায়ের বেগকে শাস্তি দেওয়া হয়। এই শতকেই সিরিয়া, তুরস্ক, পারস্য, মিশরের মতো দেশগুলোতে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কফি হাউস। ১৬২৩ খ্রিস্টাব্দে ইস্তাম্বুলে ছ শোরও বেশি কফি হাউস ছিল। আরবরা কয়েক শতাব্দী কফির ঘ্রাণে মুগ্ধ হওয়ার পর ইউরোপে কফি প্রচলিত হতে শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক ও বলকান অঞ্চল হয়ে কফি ইতালিতে যাত্রা করে। এরপর খুব তাড়াতাড়ি ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে কফি জনপ্রিয় হয়। ডাচদের মাধ্যমে পশ্চিমে আমেরিকা ও লাতিন আমেরিকায় কফির প্রচলন ঘটে। ১৭২০ সালে লাতিন আমেরিকায় কফি চাষ শুরু হয়। এদিকে প্রাচ্যের ওশেনিয়া অঞ্চলের ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায়ও কফি মানুষের মন জয় করে। 

ভারতবর্ষে চায়ের প্রচলন ব্রিটিশদের মাধ্যমে হলেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আসার বহু আগে থেকে কফির প্রচলন ছিল। ভারতবর্ষে কফির ইতিহাস চায়ের ইতিহাসের চেয়েও প্রাচীন। আর সেই প্রাচীনতার অন্য নাম—

বাবা বুদান ও সাতটি কফির দানা

1 Comments
  • avatar
    Kamar Uddin Barbhuiya

    01 July, 2021

    অজানা তথ্য জেনে সমৃদ্ব হলাম । ধন্যবাদ

Leave a reply