না-শরীরী কাহন - নিকোলাই গোগোলের ‘ডেড সোলস' এর নাট্যরূপ - ১০

                                     দ্বিতীয় অঙ্ক : তৃতীয় দৃশ্য

                      -------------------------------------------------------

 ( বিচারালয়সমূহের প্রেসিডেন্টের ঘর। ঘন্টাধ্বনি। ফুলের পাত্রসব। আনা গ্রিগোরিয়েভনা, সর্বার্থে গ্রহণযোগ্য মহিলা - সোফিয়া ইভানোভনাকে অভ্যর্থনা জানাতে ছুটে যায়। সোফিয়াও মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। সে দ্রুত ঢুকে পড়ে, পরনে মানানসই সুতির ডোরাকাটা পোশাক। উভয়ে উভয়কে করমর্দন করে, চুম্বন বিনিময় করে, সামান্য আনন্দ - চিৎকার করে ওঠে ; আবার চুম্বন করে) 

 আনা: ওঃ,আপনি এসেছেন? আমি কী যে খুশি হয়েছি! গাড়ির শব্দ পেয়ে মনে হল, কে হতে পারে! গভর্নরের স্ত্রী না অন্য কেউ। চাকরকে তো বলতেই যাচ্ছিলাম, বলে দিতে যে আমি বাড়ি নেই।

 সোফিয়া : আশা করি, খুব আগে এসে পড়িনি? আসলে আপনাকে দেখার জন্য আর তর সইছিল না।

 আনা: স্ট্রাইপটি তো দারুণ!

 সোফিয়া : বেশ মজার, তাই না? কিন্তু আমার মাসতুতো বোন বলে, এটা সরু ছোটো ছোটো স্ট্রাইপ, মাঝে আবার ছোপ ছোপ লতাপাতা আঁকা, ওপর -নিচে সব জায়গায়। ফ্রিলের বদলে পাড়ের নকশাটি… ওঃ, কী দারুণ না? ফ্রিলগুলো সব বাইরে।

 আনা: ফ্রিল বাইরে?

 সোফিয়া : হ্যাঁ, ফ্রিল বাইরে, ফেস্টুন ভিতরে, হাতে, কাঁধের নকশাতে, নিচে… সব জায়গায়।

 আনা: কিন্তু বন্ধু, এটা খুব জমকালো হয়ে যায়নি?

 সোফিয়া : আরে না, না। জমকালো হবে কেন?

 আনা: হ্যাঁ, হয়েছে।

 সোফিয়া : আপনার কি তাই মনে হচ্ছে?

 আনা: আপনি যাই বলুন, আমি হলে এমন পোশাক পরতাম না।

 সোফিয়া : আমিও পরি না। আসলে আপনার কাছে যা জবরজং মনে হচ্ছে তা কিন্তু চমৎকার। আমি আমার বোনকে স্রেফ মজা করার জন্য একটা নকশা পাঠাতে বলেছিলাম আর মেলানিয়া করল কি… সেলাই শুরু করে দিল।

 আনা: তার মানে? আপনি সত্যিই এই নকশাটা পেয়েছেন?

 সোফিয়া : বললাম তো, বোন পাঠিয়েছে।

 আনা: ওহ মাই ডার্লিং, এরপর অবশ্যই এরকম একটি আমাকে এনে দেবেন।

 সোফিয়া : কিন্তু আমি যে মাসতুতো বোনকে কথা দিয়েছি। ওকে দিয়ে তারপর আপনাকে। হবে?

 আনা: ওর পর? সোফিয়া ইভানোভনা, এতক্ষণে পরিষ্কার হল যে আপনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে অপমান করতে এসেছেন। বুঝতে পারছি, আপনি আমাদের বন্ধুতা শেষ করে দিতে চাইছেন( সোফিয়া কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে যায়। কী বলবে, বুঝতে পারে না)। ঠিকাছে, তা আমাদের সেই মজাদার মানুষটি কেমন আছেন? মঁশিয়ে চিচিকভ?

 সোফিয়া : আ মলো যা! আমি এখানে এতক্ষণ শুধু শুধু বসে কী করছি! সেই কথাই তো বলতে এসেছিলাম।

 আনা: যাক বাবা, আপনি আপনার চিচিকভের হয়ে যতই ওকালতি করুন আর ওর প্রশংসা করুন না কেন, আমি আপনাকে বলব এবং তার মুখের ওপরেও বলব, সে একটা বিরক্তিকর জীব। আপনি ভাবতেও পারবেন না, ওকে দেখে আমার যেন বমি পেয়ে গেছিল। অযোগ্য, অপদার্থ একটা মানুষ আর নাকটা… একেবারেই বিশ্রী।

 সোফিয়া : আপনি তো আমাকে কথাটি বলতেই দিচ্ছেন না। কেচ্ছাটা শুনুন…

 আনা: কী কেচ্ছা?কার কেচ্ছা?

 সোফিয়া : ওই লোকটার। আমাদের যাজক ফাদার কিরিলের স্ত্রী আমার কাছে এল, আর কী ভাবছেন? ওই কোটিপতি লোকটার ব্যাপারে কী ভাবছেন? 

 আনা: আপনি কি বলতে চাইছেন ওই লোকটা কিরিলের বউয়ের সঙ্গে…

 সোফিয়া : দূর, তাহলে তো কথাই ছিল না। শুনুন, ও কী বলল। ও বলল, মিসেস করোবোচকা নামে এক জোতদার ওর কাছে পাংশু মুখে এসে যা শোনালো না… মিশকালো অন্ধকারে মাঝরাতে দরজায় খটখট আওয়াজ… খুলে দেখে, চিচিকভ।

 আনা: এই করোবোচকা, এ কী সুন্দরী যুবতী?

 সোফিয়া : আরে না। ও এক বিধবা বুড়ি।

 আনা: বাঃ, বেশ মজার তো! এখন কি লোকটা মাঝরাতে বিধবা বুড়িদের ধর্ষণ করে বেড়াচ্ছে নাকি? আমার স্বামীকে তাহলে এ সব বলতে হয় দেখছি( বলেই স্বামীকে ফোন করতে যায়)।

 সোফিয়া : না না, আনা গ্রিগোরিয়েভনা। আপনি যা ভাবছেন মোটেও তা নয়। সে একেবারে মাথা থেকে পা অবধি ডাকাতের বেশে, অস্ত্রসজ্জিত হয়ে এসে বলে, “ তোমার যত মৃত আত্মা আছে, আমাকে বেচে দাও। এখনই।”

 আনা: কিন্তু মৃত আত্মা মানে কী? ব্যাপারটা আদৌ তা নয়। যাই হোক, আমার স্বামী বলছিল, এ ব্যাপারে নজদ্রেভ স্বভাবঢঙে মিথ্যে বলেছে।

 সোফিয়া : মিথ্যে বলেছে মানে? আমি আপনাকে বলছি যে করোবোচকা…

 আনা: ( বাধা দিয়ে) আর আমি আপনাকে বলছি, এটা আদৌ মৃত আত্মার ব্যাপার নয়। এর পিছনে অন্য কিছু আছে।

 সোফিয়া : কী?

 আনা: মৃত আত্মারা…

 সোফিয়া : কী, কী?

 আনা: মৃত আত্মারা…

 সোফিয়া : বলুন, ঈশ্বরের দিব্যি, খুলে বলুন।

 আনা: এদের ব্যবহার করা হচ্ছে অন্য কিছু গোপন করতে। আর সেই অন্য কিছু হল…গভর্নরের মেয়ের অপহরণ।

 সোফিয়া : বলেন কী? এ-তো আমি ভাবতেই পারছি না।

 আনা: আর আপনি মুখ খোলার পর থেকে এটাই আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

      ( দরজায় ঘন্টা বাজে। পোস্টমাস্টার ইভান আন্দ্রিয়েভিচ প্রবেশ করে)

 পোস্টমাস্টার : সুপ্রভাত আনা। সুপ্রভাত সোফিয়া।

 আনা: ইভান আন্দ্রিয়েভিচ, আপনি যে ঘামছেন খুব!

 পোস্টমাস্টার : এই ‘ মৃত আত্মা’ ব্যাপারটা কি বলুন তো? শহরময় এই নির্বোধ আলোচনাই তো হচ্ছে দেখছি।

 সোফিয়া : মোটেও নির্বোধ নয়, ইভান আন্দ্রিয়েভিচ। ওই লোকটা গভর্নরের মেয়েকে অপহরণের ছক কষেছে।

 পোস্টমাস্টার : আরে, আরে, ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন। কিন্তু চিচিকভ কী করে… মোটের ওপর সে তো এদেশ ওদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছিল - ও কীভাবে এমন সাহস পেল? এমন ঔদ্ধত্য! কেউ নিশ্চিত ওকে সাহায্য করছে।

 আনা: নজদ্রেভ নয়তো?

 পোস্টমাস্টার : নজদ্রেভ! ( কপাল চাপড়ে) হ্যাঁ, অবশ্যই।

 সোফিয়া : নজদ্রেভ!

 আনা: নজদ্রেভ! নজদ্রেভ! হ্যাঁ, ওকে এ সব কাজই মানায়। এক সময় ও কী করেছিল জানেন? ওর বাবাকেই বিক্রি করে দিচ্ছিল… অথবা, না,না… ও মনে হয় তাসখেলায় একে হারিয়ে দিয়েছে।

         (তীক্ষ্ণ ঘন্টাধ্বনি শোনা যায়)

 পোস্টমাস্টার : ওহো, এবার আমাকে যেতে হবে।

 আনা: এইতো সবে এলেন।

 পোস্টমাস্টার : সুপ্রভাত ভদ্রমহিলাগণ! ( সে দুমদাম শব্দে দরজার ওপর প্রেসিডেন্টকে ধাক্কা দেয় প্রায়)

 প্রেসিডেন্ট : ইভান আন্দ্রিয়েভিচ, আমাদের দেখা হচ্ছে মনে হয়।

 পোস্টমাস্টার : একটা নতুন বিষয়… এক্কেবারে নতুন… দেখতে হচ্ছে… আমি ফিরে আসছি( এই বলে সে বেরিয়ে যায়)।

 প্রেসিডেন্ট : সোফিয়া ইভানোভনা! ( তার হাতে চুম্বন দেয়)

 আনা: নতুন খবর শুনেছেন?  এক্কেবারে টাটকা।

 প্রেসিডেন্ট : কী সে, আমার ছোট্ট গানপাখি?

 আনা: ওই লোকটা গভর্নরের মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চায়।

 প্রেসিডেন্ট : ও,লর্ড!

 সোফিয়া : আচ্ছা বন্ধুবর আনা গ্রিগোরিয়েভনা, আমি এবারে যাই।

 আনা: কোথায়?

 সোফিয়া : গভর্নরের গিন্নির কাছে।

 আনা: তাই! তবে আমিও যাই চলুন।

 সোফিয়া : সেখান থেকে মাসতুতো বোনের কাছে যাব।

 আনা: আমি অবশ্যই আপনার সঙ্গে যাব। ওদের না দেখা অবধি আমি থাকতে পারছি না। আঃ, আমার ভিতরে কী যে হচ্ছে না! ( উভয়েই বেরিয়ে যায়। ওদের গাড়ির চলে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়)

 প্রেসিডেন্ট : শাশা…শাশা…

 শাশা: ( প্রবেশ করে) বলুন স্যার?

 প্রেসিডেন্ট : ওদের বলে দাও, শহরের পদস্থ কর্মচারী ছাড়া কাউকে যেন ঢুকতে না দেয়। বুঝলে? আর চিচিকভ যদি আসে বলবে আমি বাড়ি নেই। শুনতে পেলে?

 শাশা: পেলাম স্যার, ইভান গ্রিগোরিয়েভিচ।

 প্রেসিডেন্ট : এক মিনিট, শাশা, আমাদের জন্য হালকা জলখাবার বানাও।

 শাশা: হালকা স্যার?

 প্রেসিডেন্ট : হ্যাঁ, হালকা, হালকা, হালকা।

 শাশা: ঠিকাছে স্যার।

   ( ও চলে যায়। গভর্নর আর পুলিশকর্তাকে নিয়ে কথা বলতে বলতে পোস্টমাস্টার ঢোকে। আর এক পুলিশকর্মী দরজার বাইরে খাড়া থাকে। সকলকেই খুব চিন্তিত মনে হয়। আর খানিকটা দুবলাও যেন) 

 পুলিশকর্তা: ইভান গ্রিগোরিয়েভিচ।

 গভর্নর : আমার মাথাটা তো বাঁই করে ঘুরে গেল। আমি তো এ সবের কিছুই বুঝতে পারছি না। এই চিচিকভ কে? কী? মৃত আত্মাদের ব্যাপারটাই বা কী? আবার এখন শুনছি আমার মেয়েও নাকি এ সবে জড়িত ; তাইতো ওকে ঘরে আটকে রাখতে হয়েছে।

 পোস্টমাস্টার : তাইতো, তাইতো মহামহিম! আমরা সব্বাই তো ওই লোকটার কথার ঢঙে,চেহারার চাকচিক্যে একেবারে বোকা বনে গেছি।

 গভর্নর : ঠিক তাই।

 প্রেসিডেন্ট : এখন? 

 পুলিশকর্তা: হুঁ।

 প্রেসিডেন্ট: ( পুলিশকর্তাকে) আপনি সবাকেভিচের কাছে গেছিলেন? 

 পুলিশকর্তা: হ্যাঁ, গেছিলাম।

 প্রেসিডেন্ট : তো…

 পুলিশকর্তা: ও বলল, এসব ব্যাপারে সে থুতু ফেলে।

 গভর্নর : কী?

 পুলিশকর্তা: থুতু ফেলে, মহামহিম। সে বলেছে, চিচিকভ একজন ভালো ব্যবসায়ী আর দারুণ সব ভূমিদাসদের ওর কাছে বেচেছে সে আর তারা পুরো জ্যান্ত বলতে যা বোঝায় তাই। কিন্তু এটা সে বলতে পারেনি যে স্থানান্তরের সময় ওদের কী অবস্থা হবে ; রাস্তায় জ্বরজ্বালা বা পথকষ্টে ওদের কী হবে! আমি যতটা সম্ভব ভয় দেখিয়ে বললাম, গোটা শহর এই গুজবে ছেয়ে গেছে। সে বলল, তার কারণ শহরটাই বোকা গাধায় ভরে গেছে।

          ( পুলিশকর্মী হেসে ওঠে)

 পুলিশকর্তা : এই বলে সে বাড়ি চলে গেল।

 প্রেসিডেন্ট : নজদ্রেভের খবর কী? সে কি আসছে?

 পুলিশকর্তা: ওকে জাগিয়ে দেওয়ায় ও তো রেগে কাঁই। বলে কিনা, তুমি মরোগে যাও। নরকে যাও।

 গভর্নর : নরকে?

 পুলিশকর্তা: হ্যাঁ, নরকে, মহামহিম। কিন্তু আমি তাকে বলেছি, তাসখেলা হবে, খানাপিনাও আছে। তাই ও আসবে।

 গভর্নর : এটা ভালো করেছ।

 পুলিশকর্তা: তা যা বলেছেন… ভদ্রমহোদয়গণ, আমাদের এখন যে কোনওভাবে বিষয়টার ভিতরে ঢুকতে হবে। আমি অবশ্যই বলব যে গভর্নর সাহেবের কাছে দুটো যোগসূত্র এসেছে। এই তার কাগজ।

         ( গভর্নর দুটো কাগজ হাতে নিয়ে নাড়তে থাকেন। মুখে ব্যর্থতার ভাব)

 পুলিশকর্তা: ধন্যবাদ স্যার, ওরা বলছিল যে আমাদের এখানে নাকি জাল নোটের বিশাল কারবার চলছে ; হাইওয়েতে ডাকাতি আর খুনের জন্য একজনের তল্লাশি চলছে, লোকটা নাকি ফেরার। এখন এদের মধ্যে কেউ হতেই পারে এই চিচিকভ। আমরা তো কখনও ওর কাগজপত্র দেখিনি, দেখেছি কি স্যার?

 গভর্নর : ও এতটাই ধোঁয়াটে যে কিছুই মনে করতে পারছি না। ও বলছিল, ন্যায়ের কারণে ওর ভোগান্তি হয়েছে খুব আর তার নাকি শত্রুও অনেক।

 পুলিশকর্তা: ধন্যবাদ স্যার, এখন শেষ কথা হল… বুঝতে পারছি না, এটা আপনাদের কাছে বলব কি না, কিন্তু কেউ কেউ বলে, চিচিকভ নাকি ছদ্মবেশে নেপোলিয়ন। আমরা অবশ্য এখন তার উচ্চতা - টুচ্চতা পরখ করছি।

 গভর্নর : বলেন কী! হা ভগবান!

 প্রেসিডেন্ট : ঠিকাছে ভদ্রমহোদয়গণ, তাহলে বলুন…

 পুলিশকর্তা: আমি বলব, আমাদের চরম পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

 প্রেসিডেন্ট : চরম!

 পুলিশকর্তা: ওকে ক্রিমিনাল হিসেবে এখনই গ্রেপ্তার করা উচিত।

 প্রেসিডেন্ট : উলটে যদি ও-ই আমাদের গ্রেপ্তার করে, খারাপ লোক বলে?

 পুলিশকর্তা: আমাদের?

 প্রেসিডেন্ট : ধরে নিন, ও গভর্নর জেনারেলের কাছ থেকে কোনও গোপন নথিসহ এখানে এসেছে। ও যে রাজধানী থেকে এসেছে তা তো আমরা জানি। মৃত আত্মা! অদ্ভুত! হয়তো ওর মনে অন্য কোনো মৃতদের বিষয় লুকিয়ে আছে। হুঁ…। আমাদের গুপ্ত ঘরে কয়েকটি কঙ্কাল? হাসপাতালে? জেলখানায়? আইনের রক্ষক হিসেবে আমার কথা ধরতে পারছেন, আপনারা?

 পোস্টমাস্টার : আমি তো ধরুন ডাক- ফাক নিয়ে থাকি?

 প্রেসিডেন্ট : ইভান আন্দ্রিয়েভিচ, আপনার এটুকুই বলার?

 পোস্টমাস্টার : না, আমি ভাবছি…ভদ্রমহোদয়গণ, আমাদের মনে হয় এখন এক সঙ্গে মিলিত হওয়া দরকার।

               ( নীরবতা)

 পুলিশকর্তা: আমরা তো মিলিত হয়েই আছি।

 পোস্টমাস্টার : তা ঠিক, তবে আমাদের একটি যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

 পুলিশকর্তা: হে মহামহিম?

 গভর্নর : এই প্রস্তাবকে আমি মনেপ্রাণে সমর্থন করি।

 প্রেসিডেন্ট : ( পুলিশকর্তাকে) ঠিকাছে। আপনি কি চিচিকভের কাগজপত্র দেখেছেন?

 পুলিশকর্তা: না, ইভান গ্রিগোরিয়েভিচ।

 প্রেসিডেন্ট : ( রাগতভাবে) দেখেননি কেন?

 পুলিশকর্তা: তার সঙ্গে ঘরে অন্যান্যরাও ছিল। ডুমুরের রস আর দুধের মিশ্রণ দিয়ে গার্গল করছিল। এখন আমাদের পরবর্তী উৎকৃষ্ট সূত্রটাই ধরতে হবে। পেত্রুশকা…

       ( পুলিশকর্মী পেত্রুশকাকে নিয়ে আসে - সে খানিক রুক্ষ, হাতে ঘোড়া তাড়ানোর চাবুক)

 পুলিশকর্তা: এই যে ভালোমানুষ, তোমার প্রভু সম্পর্কে কিছু বলোতো?

 পেত্রুশকা : হ্যাঁ স্যার, বলি… তিনি…

 পুলিশকর্তা : কী বলতে চাইছ?

  পেত্রুশকা : মানে, মহাশয়গণ, আপনারা তো জানেন… একজনের কাছ থেকে শুনে অপরকে বলা…

 পুলিশকর্তা: সে কোন ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশত?

 পেত্রুশকা : ওপর মহলের মানুষ সব স্যার, একজনের নাম মনে হয় মি. পেরেক্রোইয়েভ।

 পুলিশকর্তা: তিনি কোথায় কাজ করতেন?

 পেত্রুশকা : সরকারি চাকরি স্যার… সিলভার সার্ভিসে।

 পুলিশকর্তা: সিভিল সার্ভিসে?

 পেত্রুশকা : হ্যাঁ স্যার, ওই সিলভার সার্ভিসে। পোশাক দপ্তরেও। আর সরকারি বাড়িঘর দপ্তরেও।

 পুলিশকর্তা: কোন ধরনের বাড়ি? নির্দিষ্ট করে বলো।

 পেত্রুশকা : ওঁর তিনটে ঘোড়া আছে স্যার। একটা তিন বছর আগে কেনা। তারপর তিনি ধূসর রঙের ঘুড়ীর ব্যাবসা করেন। কেন, তা তো আপনারা জানেনই। আবার আর একটা ধূসর ঘুড়ী ( হেসে ফেলে) তার নাম, কুবারি। এ সব লিখে নিলেন তো স্যার?

 পুলিশকর্তা: আমাদের এখন বলো, এই চিচিকভই কি আসলে প্যাভেল ইভানোভিচ?

 পেত্রুশকা : ঠিক ধরেছেন স্যার। এখন এই চেয়ারম্যান ঘোড়াটি দারুণ টানে স্যার ; ওকে আমি এক কাপ বাড়তি ওটফল দেব… দারুণ টানে…টগবগিয়ে… হেই,হেই,...ছোট, আমার আরবি ছানা… ( হাতের চাবুকটা সে এমনভাবে দোলাতে থাকে যেন রাস্তায় আছে)

 পোস্টমাস্টার : লোকটা মুচির মতো মাতাল হয়ে আছে।

 পুলিশকর্তা: তোমার আগাপাশতলা চাবকাব। বদমাশ!

 পেত্রুশকা : ( গায়ের কোট খুলে) আপনার যেমন মর্জি স্যার। তাহলে এটা নিন স্যার ( আবার চাবুকটি নাড়তে থাকে)

 পুলিশকর্তা: বেরিয়ে যাও। বেরোও এখান থেকে।

 পেত্রুশকা : ( বিমর্ষ) আমাকে চাবকাবেন না স্যার?

 পুলিশকর্তা: বেরোও বলছি।

 পেত্রুশকা : ( বেরিয়ে যায়) হেই…হেই…হু…র…র… ছোট…চল…

             ( নীরবতা)

 প্রেসিডেন্ট : আমার মনে হয় লোকটা যাদের কাছ থেকে চাষাদের কিনেছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।

 পুলিশকর্তা: ( পুলিশকর্মীকে) মিসেস করোবোচকাকে এনেছ কি? তাকে এখানে আসতে বলো।

                    ( করোবোচকা প্রবেশ করে)

 পুলিশকর্তা: ( কর্কশভাবে) অল রাইট।

 প্রেসিডেন্ট : আমাকে একটু বলতে দিন। আচ্ছা মাননীয়া, আপনি কি এই আদালতকে বলবেন কোনও এক রাতের আঁধারে জনৈক ব্যক্তি আপনাকে বাড়ি এসে শারীরিক নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে আপনার কিছু প্রজা চাষিকে তার কাছে বিক্রি করতে চাপ দিয়েছিল কি না?

 করোবোচকা : আমার এই দুর্দশায় দাঁড়িয়ে ভাবুন স্যার… পনেরো রুবল… নগদে…আমি তো এক অসহায় বিধবা… আনাড়ি মেয়েছেলে…

 প্রেসিডেন্ট : তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু আমরা তো আসল ঘটনাটি জানতে চাইছি ম্যাডাম। ঘটনা এবং অবস্থা। বুঝলেন? লোকটার কাছে পিস্তল ছিল কি?

 করোবোচকা : আরে না, না। ঈশ্বরের কৃপায় ওর কাছে কোনও পিস্তল - টিস্তল দেখিনি। কিন্তু আমি তো অসহায় বিধবা স্যার। আমি তো পিস্তলের ব্যাপারে তেমন কিছু জানিও না, বুঝিও না। আপনি কি এটা বুঝতে আমাকে এট্টু সাহায্য করবেন? এখন দাম কত চলছে স্যার? 

 প্রেসিডেন্ট : দাম!কীসের?  আরে ম্যাডাম, দামের কথা কে বলছে?

 করোবোচকা : আচ্ছা স্যার, একটা মৃত আত্মা… আজ কত চলছে?

 গভর্নর : হা ঈশ্বর!

 করোবোচকা : পনেরো রুবল, নগদ। আমি কী-ই বা করতাম? হয়তো দাম হতে পারত পঞ্চাশ বা তারও বেশি…!

 পুলিশকর্তা: দেখি, ওই ব্যাঙ্ক নোট দেখি( ভয় দেখিয়ে) আদালতের সামনে দেখাও( হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে) হুঁ, এটি ব্যাঙ্ক নোটই বটে।

 প্রেসিডেন্ট : ঠিকাছে ম্যাডাম, এখন পরিষ্কার করে আমাদের বলুন তো কীভাবে আপনার কাছ থেকে ওই লোকটা কিনল, আর কিনলই বা কী? আপনার কথাবার্তা থেকে বোঝা যাচ্ছে না কিছু।

 করোবোচকা : সে কিনেছে! সে কিনেছে! আপনাদের তো বললাম ; কিন্তু আপনারা এই বৃদ্ধা বিধবাকে কেন এখনও বলছেন না, আজকের দিনে একটি মৃত আত্মার সঠিক দাম কত! যদি সে খারাপ না হয়ে যায়?

 প্রেসিডেন্ট : আবার ম্যাডাম, আবার আপনি বাঁকা পথে যাচ্ছেন? আপনি কী বলতে চাইছেন? কী? মরা আত্মা বিক্রি করতে কাউকে কখনও দেখেছেন কী?

 করোবোচকা : কিন্তু কেন, কেন, কেন আপনারা আমাকে দামটা বলছেন না?

 প্রেসিডেন্ট : ওঃ, দাম, দাম আর দাম! কীসের দাম? এর কোনও দাম নেই। শুনুন ম্যাডাম, স্পষ্ট রুশ ভাষায় আমাদের বলুন, লোকটা কি আপনাকে ভয় দেখিয়েছিল?যদি দেখিয়ে থাকে তবে কী দিয়ে? 

 করোবোচকা : কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, ব্যাপারটা কী! আপনি নিজেই ব্যবসায়ী। আপনি চান…

 প্রেসিডেন্ট : মহাশয়া, আমি বিচারালয়গুলির প্রেসিডেন্ট…

 করোবোচকা : না, না… আপনি পুচকে শয়তান। আপনি নিজেই কিনতে আমাকে এখানে এনেছেন।  যাই হোক স্যার, আমি আপনাকে কয়েকটি সুন্দর বালিশের পাখনা বেচতে পারি।

 প্রেসিডেন্ট : ও সব পাখনা- টাখনা রাখুন তো!

 করোবোচকা : ( বাইরে বের করে দেবার সময়… অসন্তুষ্ট অবস্থায় গর্জাতে থাকে) বুঝেছি মশাই, আপনার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছি। আপনি আমাকে ঠকিয়ে কম দামে কিনতে চান… এটা আমার মুখের ওপর বসানো নাকটির মতোই স্পষ্ট।

 পুলিশকর্তা: ওফ্‌…কী জ্বালা রে বাবা…!

 গভর্নর : ( দুর্বলভাবে) ভদ্রমহোদয়গণ, আমরা ঠিক লক্ষ্যস্থলে ঘা দিতে পারছি না…

          ( নজদ্রেভের পিছন পিছন মিঝুয়েভ প্রবেশ করে)

 নজদ্রেভ : এইতো, এইতো, সবাই আছেন। মহামহিমও আছেন দেখছি! আর বিচারকও!

 পুলিশকর্তা: আপনার শ্যলককে আমাদের দরকার নেই।

          ( মিঝুয়েভকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। একটা ট্রেতে খাবার পানীয় নিয়ে শাশা প্রবেশ করে)

 নজদ্রেভ : আমাদের শালাকে দরকার নেই… আঃ, সরকারের ক্ষমতা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে… সব সময় খাবার জন্য কামড় ( একটা গ্লাসে মদ ঢেলে পান করে গ্লাসটি রাখে)। তাস কে পেয়েছে?

 পুলিশকর্তা: আমরা সবাই, পাব। আমাদের শুধু বলুন, এইসব মরা আত্মা - টাত্মা নিয়ে হচ্ছেটা কী? চিচিকভ যে মরা মানুষদের কিনছে তা সত্যি না মিথ্যে?

 নজদ্রেভ : সত্যি( আবার পান করে)।

 গভর্নর : কিন্তু এটা তো একটা উদ্ভট ব্যাপার, তাই না?

 নজদ্রেভ : না, মোটেও না। ওহে, এটা কী? তাসগুলি কোথায়? 

 পুলিশকর্তা: পরে, পরে… আচ্ছা, ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, মহামহিম… বলুন তো, চিচিকভের মরা মানুষদের সঙ্গে আপনার মেয়ে জড়িয়ে গেল কীভাবে?

 নজদ্রেভ : ওই লোকটা ওদের ওই মেয়েটাকে উপহার স্বরূপ দিতে চেয়েছিল, জানেন কি?

 গভর্নর : মরা আত্মা! আমার মেয়েকে! ( এ কথা শুনে গভর্নর দুর্বল হতে থাকেন যেন, শুনানি প্রক্রিয়া চলতে থাকে)

 প্রেসিডেন্ট : এমনটা কি সম্ভব যে লোকটা আমাদের বিষয়ে কোনও তদন্তে এসেছে? গুপ্তচর নয় তো?

 নজদ্রেভ : অবশ্যই, সে একটা টিকটিকি।

 প্রেসিডেন্ট : সত্যিই?

 নজদ্রেভ : আমি নিশ্চিত। ইস্কুলে যখন পড়তাম… জানেন, আমরা এক সঙ্গে স্কুলে পড়তাম? ওকে সব সময় বিশ্বাসঘাতক আর ‘ স্নিচিকভ’ বলে ডাকতাম। একবার কী একটা ব্যাপারে হাতেনাতে ওকে ধরে উত্তম-মধ্যম দিয়েছিলাম ; পরে সবাই মিলে ওর মাথায় শতখানেক জোঁক সেঁটে দেওয়া হয়েছিল।

 প্রেসিডেন্ট : ( এই তথ্য লিখতে লিখতে) কত বললেন? একশো!

 নজদ্রেভ : না, মানে, ডজনখানেক হবে।

 পুলিশকর্তা: লোকটা কি জাল নোটের কারবারি হতে পারে?

 নজদ্রেভ : অবশ্যই সে জালিয়াত ( পান করে)। এই ব্যাঙ্ক নোটগুলো সে চারদিকে ছড়াচ্ছে — ঠাট্টা মন্দ নয়তো! একদিন সবাই জানল, ওর ঘর থেকে বিশ লক্ষ জাল নোট পাওয়া গেছে, তাই ওর বাড়ি সিল করে দেওয়া হয়েছে আর…

 পুলিশকর্তা: দেখুন, সরাসরি সহজভাবে আমাদের যদি সব বলেন তাতে আপনারই মঙ্গল। চিচিকভ গভর্নর সাহেবের মেয়েকে অপহরণের ছক কষেছিল কি? 

 নজদ্রেভ : অবশ্যই কষেছিল। আমি সেখানে ছিলাম। বলছি শুনুন… আমাকে ছাড়া এই বিষয়টা শুরুই হতে পারত না।

 প্রেসিডেন্ট : ওরা কি বিয়ে করতে যাচ্ছিল? ( গভর্নর জোর দীর্ঘশ্বাস ফেলেন)

 নজদ্রেভ : অ্যাবসোলিউটলি। ট্রাক- মা- চো - ভ- কা গ্রামে। বুঝেছেন? ফাদার সিডর ওদের বিয়ে দিত। বিয়ে প্রতি তিনি পঁচাত্তর রুবল নিয়ে থাকেন।

 পোস্টমাস্টার : এটা কিন্তু বেশি।

 নজদ্রেভ : আপনার কাছে সবই বেশি। আমি এ ব্যাপারে ওকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলাম যেহেতু আমি জানতাম, সে তার পাতানো বোনের সঙ্গে শস্য ব্যবসায়ী মিখাইলের বিয়ে দিয়েছিল যখন ওর প্রথম স্ত্রী জীবিত। বুঝলেন? তখন তাকে আমি আমার ছোট্ট ঘোড়াগাড়িটা দিয়েছিলাম - আর ঘোড়াও।

 পুলিশকর্তা: কাকে? ঘোড়াগুলি কে পেল? শস্য ব্যবসায়ী না ওই যাজক?

 নজদ্রেভ : তাতে আপনার কী? কুৎসা রটানোর নোংরা মাস্টার আপনি। সব সময় পরের ব্যাপারে নাক গলানো আর নোংরা ঘাটা!...তাসের সময় হল? আপনারা আমার কবি - নীরবতাকে ভঙ্গ করেছেন। ও, চিচিকভ। ঠিক। তাই?

 প্রেসিডেন্ট : এ বিষয়ে কিছু বলাটাও অদ্ভুত!...কিন্তু আপনার কি বিন্দুমাত্র জানা আছে যে চিচিকভ বাস্তবিকই নেপোলিয়ন - গোটা শহরে এমনটা রটল কী করে?

 নজদ্রেভ : সে নেপোলিয়ন।

 প্রেসিডেন্ট : সে নেপোলিয়ন?

 গভর্নর : ( পুরো হতাশ হয়ে) লোকটা নেপোলিয়ন!

 নজদ্রেভ : এ ব্যাপারে কোনও প্রশ্নই চলে না।

        ( সকলেরই মুখচোখে দ্বিধা, ভয়। নজদ্রেভের কোনও কথা কি ওরা বিশ্বাস করে? গভর্নর মাথা গুঁজে থাকেন, তিনি আর পারছেন না)

 প্রেসিডেন্ট : কিন্তু…কী…কীভাবে?

 নজদ্রেভ : ছদ্মবেশে ( আবার পান করে)  বুঝলেন? সাধারণ পোশাক পরে।

 পুলিশকর্তা: দেখুন, আপনি যা বলছেন তার একবর্ণও বিশ্বাসযোগ্য নয়।

 নজদ্রেভ : ( চুপিচুপি) দেখুন, ওরা ওকে লম্বা লাগামে বেঁধেছে।

 পুলিশকর্তা: কারা?

 নজদ্রেভ : ইংরেজরা। ব্রিটিশ সিংহকে অত ছোটো ভাববেন না। ওঁরা ওই লোকটাকে সেন্ট হেলেনা থেকে ছেড়ে দিয়েছে যাতে করে ও চিচিকভের ছদ্মবেশে রাশিয়ার অন্দরমহলে ঢুকে যেতে পারে। কিন্তু শুনুন…

          ( সকলে কাছাকাছি চলে আসে। নজদ্রেভ ওদের ওপর ঝুঁকে পড়ে)

 নজদ্রেভ : আসল ঘটনা হল, লোকটা আদপেই চিচিকভ নয়।( নজদ্রেভ আবার মাতলামি করতে থাকে। পুলিশকর্তার তেকোনা টুপিটা নিজের মাথায় পরে নেয়, সকলের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসে। পরে ঘুমিয়ে পড়ে। পুলিশকর্মী পুলিশকর্তাকে একটুকরো কাগজ এনে দেয়)

 প্রেসিডেন্ট : ভদ্রমহোদয়গণ, আমরা কি কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পেরেছি?

 পোস্টমাস্টার : আমি একটি দিশা পেয়েছি মশাই। আমি পেয়েছি। এই চিচিকভ যে আসলে কে তা কি আপনারা বুঝতে পেরেছেন?

 সকলে: কে সে? কে?

 পোস্টমাস্টার : এই লোকটা স্যার, ক্যাপটেন কোপেইকিন ছাড়া আর কেউ নয় যে আবার ফিরে এসেছে।

 প্রেসিডেন্ট : ক্যাপটেন কোপেইকিনই বা কে, জানতে পারি কি?

 পোস্টমাস্টার : ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা তাহলে কোপেইকিনের নামই শোনেননি?

 পুলিশকর্তা: না।

 পোস্টমাস্টার : ( নস্য কৌটো থেকে একটিপ আঙুলে নিয়ে নড়েচড়ে বসে। আর কাউকে দেয় না) আচ্ছা, এই ক্যাপটেন কোপেইকিন - এই লোকটা লেখকদের জন্য গল্প তৈরি করে দিত… আবার তা মহাকাব্যও হতে পারে… মহাকাব্য।

 পুলিশকর্তা: তো?

 পোস্টমাস্টার : তাই ভদ্রমহোদয়, আমি সব সময় এভাবেই বলি যদিও প্রকৃতই উপস্থিত সকলকে উদ্দেশ্য করে নয়… যাই হোক, ১৮১২ সালের আন্দোলনের পরের ঘটনা। আহত যাদের তখন বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে এই ক্যাপটেন কোপেইকিন ছিল। আমি দুঃখিত স্যার, একদম ভুলে গেছি…হয় ক্র‍্যাশনোয়েতে নয় লাইপজিগে কোথাও একটা হবে এই ক্যাপটেনের হাত অথবা পা উড়ে গেছিল। তখনকার দিনে মশাই, এমন কোনও বিশেষ নির্দেশ ছিল না যে হাত বা পা বা উভয়ই যদি উড়ে যায় তবে কী হবে… অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি যে এই ধরনের যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে বাঁচার কী ব্যবস্থা ছিল,... তারা কি কোনও কাজ পাবে নাকি না খেয়ে মরবে… কোনটা… তা একদমই ঠিক ছিল না।

      যাহোক মশাই, আমি আপনাদের স্মরণ করতে বলছি, এই কোপেইকিনের একটা হাতই ছিল… ঠিক মনে পড়ছে না… তবে মনে হয় বাঁ হাতটা ছিল যা দিয়ে খুব কষ্টে ও নাক-টাক ঝাড়ত। একা কাজের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে সম্রাটের সঙ্গে দেখা করে বলতে চেয়েছিল, কীভাবে দেশের জন্য সে তার রক্ত বইয়েছে… শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খুইয়েছে।

      এখন দেখা যাচ্ছে, এই সেই একপেয়ে বিচিত্র জীব আমাদের রাজধানী পিটার্সবার্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে… কথাবার্তা, চলাফেরায় একদম এক… এ বিশ্বে আর কারও সঙ্গে এমন মিল নেই… একটা নিয়মিত মজাদার চলাফেরা, রাস্তা এক অথচ নাম আলাদা… যেমন নেভস্কি অ্যাভেন্যু, আরও আরও সব… সাপের মতো বাঁকা সিঁড়ি উঠে গেছে আর সেতুগুলো কোনও সাপোর্ট ছাড়াই বাতাসে ঝুলছে… এক কথায়, মশাই, সব জায়গা থেকে যেন টাকার গন্ধ আসছে আর কোপেইকিনের তেমন কোনও পয়সাকড়ি নেই। সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফার্স্ট মিনিস্টারের সঙ্গে দেখা করতে যায়। সে বাড়ির জানলার শার্সিগুলো, বিশ্বাস করুন, ফুট দশেক উঁচু… মসৃণ, পালিশ করা, যাতে করে ঘরের ভিতরের জিনিসপত্র যেমন, চায়না-ভাস, দরজার ছিটকিনি, বাইরে থেকে সব পরিষ্কার দেখা যায়। এমন একটা জায়গায় কোপেইকিন দাঁড়িয়ে… তা প্রায় চার ঘন্টার কম নয় আবার সাত ঘন্টার বেশিও নয়। মন্ত্রী এলেন। ঝড়ের মুখে পাতার মতো সবাই কাঁপতে লাগল। ‘ কাকে চাই?’, ‘ কী দরকার?’ এই হুঙ্কারে প্রায় সবাই মূর্ছা যায় কিন্তু ভদ্রমহোদয়, এই কোপেইকিন ধীরে ধীরে তার কাহিনি শুরু করে, এ কথা সে কথা… কীভাবে দেশের জন্য হাত-পা খোয়ালো… তারপর বেকার ; এবং এভাবেই মন্ত্রীমহোদয়কে বোঝাতে চেষ্টা করল, সে কী তাহলে না খেতে পেয়ে মরবে?

     ‘ তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে’, মন্ত্রী হাঁকড়ে ওঠেন, ‘ সম্রাট ফিরে এলে এমনতরো আহতদের জন্য ডিক্রি জারি হবে।’ ‘ তখনই ব্যবস্থা হবে তাহলে?’, কোপেইকিন জানতে চায়। ‘ সময় এলে তোমাকে ডাকা হবে’।’ ‘ তাহলে এখন আমি কী করব?’, কোপেইকিন জানতে চায়, ‘ এই খিদে, এই উপোস নিয়ে আমি কী করব?’... ‘ তোমাকেই রাস্তা খুঁজে নিতে হবে… কোনও কাজ দেখে নেবার চেষ্টা করো।’’... নেক্সট…

     মন্ত্রীমহোদয়ের কর্মকর্তারা তাঁর সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছিল, তারা বলছিল, খুবই গুরুত্ববহ একটি বিষয়… আর এদিকে হ্যাপা হয়েছে কি, এই পূর্বতন ক্যাপটেন ঘর থেকে বেরোতেই চায় না। মন্ত্রী তো মহা বিরক্ত, কোপেইকিনকে হুকুম করে খুঁতো শরীরটা নিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে, অথচ কোপেইকিন, কী বলব মশাই, ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে একটি হাত মুঠো করে তাঁর পানে এগিয়ে যায়… একেবারে ভিতর নড়িয়ে দিতে… ভাবতে পারেন? ‘ সেনাপতি, এই লোকটাকে ঘরে পাঠিয়ে দাও, একেবারে সরকারি খরচায়।’ এই সেনাপতি লোকটা, স্যার, প্রায় ছ ফুট ছয়, দাঁতের ডাক্তারের মতো হাতের মুঠো… সে কোপেইকিনকে একটা ভাঙাচোরা ট্যাক্সিতে গুঁজে দিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে গেল।

        কোপেইকিন এসব দেখেশুনে বলল, যাক, বিনেপয়সাতে ট্যাক্সি চড়া দিয়ে তো শুরু হল। চিন্তা করবেন না, হে প্রভুদল, একটি আয়ের উৎস আমি ঠিকই জুটিয়ে নেব।

       এরপরই এই ক্যাপটেনের সমস্ত গল্প-কাহিনি, ওই যে কবিরা বলে না, যেন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেল। কোথায় যে উঠে গেল এই কোপেইকিন!? কী যে হল ওর! কেউই জানল না। আর এখানেই সেই মজাদার বিষয়, স্যার, মাস দুয়েকও যায়নি… আসলে আমার মনে হয় এখান থেকেই ওর কাহিনি শুরু করা উচিত ছিল… হঠাৎ একদল পলাতক আর গলাকাটার দল ঘুরে বেড়াতে লাগল রিয়াজানের জঙ্গলে… ( অশুভভাবে)... শুরু হল সশস্ত্র ডাকাতি আর খুন… যেমনটি মহামহিমের চিঠিতে উল্লেখ আছে। আর, মহাশয়, এই দলের পাণ্ডা ও ছাড়া আর কেউ নয়।

 ক্যাপটেন কোপেইকিন : ( দরজায় তার উপস্থিতি জানান দিয়ে)... ক্যাপটেন কোপেইকিন…

 গভর্নর : উরিব্বাস!( পড়ে মারা যায়)

 প্রেসিডেন্ট : ( ভয় পেয়ে) আমরা আপনার জন্য কী করতে পারি স্যার?

 কোপেইকিন : আমি ক্যুরিয়ার সার্ভিসের ক্যাপটেন কোপেইকিন। সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে চিঠিপত্র এসেছে ( গলা খাঁকারি দিয়ে চলে যায়)।

 প্রেসিডেন্ট : ( খাম খুলে পড়তে থাকে) কনগ্রাচুলেশনস। আমাদের এই প্রদেশে একজন গভর্নর জেনারেলকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি খুব তাড়াতাড়ি এখানে ভিজিটে আসবেন।

 পুলিশকর্তা: ( পোস্টমাস্টারকে) ইভান আন্দ্রিয়েভিচ! চিচিকভ কীভাবে ক্যাপটেন কোপেইকিন হতে পারে? আপনি বলেছিলেন, ক্যাপটেনের একটা হাত আর পা নেই অথচ চিচিকভ…!

 পোস্টমাস্টার : ( কেঁদে কেঁদে কপাল চাপড়াতে থাকে) অবশ্যই। আমি তো তা ভুলেই গেছিলাম! আমি একটা বাছুর, গাধা!

 পুলিশকর্তা: আমরা চিচিকভকে গ্রেপ্তার করব। ও একটা অকাম্য চরিত্রের শয়তান।

 প্রেসিডেন্ট : হা ঈশ্বর! আমাদের মহামহিম গভর্নরের কী হল? এই কে কোথায়, এস, হাত লাগাও, জল…জোঁক নিয়ে এস। ওঁর রক্ত বের করতে হবে… হা প্রভু! হে মহামহিম! উনি এভাবে মারা যেতে পারেন না।

      ( মিঝুয়েভ সাহায্যের জন্য দরজায় খাড়া হয়)

 নজদ্রেভ : আমি কি দেরি করে ফেললাম?