ভাঙের চাটনি--রাগ দরবারি

ঋদ্ধি ও সিদ্ধি ছিলেন সম্পদের দেবতা কুবেরের দুই স্ত্রী, সম্পদের দেবতার কাছ থেকে তাঁদের কেড়ে আনেন গণেশ এবং নিজের জায়া হিসাবে গণ্য করেন। জনগণেশের এ হেন ব্যবহার হোক কিংবা বিপ্লব বা বিদ্রোহ, “সিদ্ধি ছাড়া কোন কার্য্য সিদ্ধ নাহি হয়”

প্রথমেই বলে রাখা দরকার ভাঙের চাটনি হয় বীজ দিয়ে এবং সেটা নেশার বস্তু নয়। পোস্ত-র বীজ যেমন খাওয়া হয়, এটিও তেমনি খাবার। পোস্তর বীজ দিয়ে তরকারি হয়, তার ফুল বা পাতা হল নেশার বস্তু। তেমনি ভাঙের বীজও উপাদেয়, ফুল-পাতা নেশার দ্রব্য। ভাঙ-বীজের চাটনি উত্তরাখণ্ডে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে হর-কি-দুন উপত্যকায়। সেখানে এটি বেশ সহজলভ্যও বটে। স্বর্গারোহিণী চূড়া যাঁরা আরোহণ করতে গিয়েছেন, তাঁরা নিশ্চয় শুনেছেন, পাণ্ডবরা মহাপ্রস্থানের পথে এই শীর্ষকে অতিক্রম করেছিলেন। স্বর্গের পথে যেতে যেতে ভীমের পতন হয়েছিল তাঁর অতিরিক্ত খাদ্যপ্রীতির জন্য। মধ্যম পাণ্ডবের ছিল রাক্ষসের মতো ক্ষুধা। রাজস্থানী মৌখিক বয়ান থেকে জানা যায়, তিনি ভাঙ-অনুরক্ত ছিলেন। ভাঙ হল ক্ষুধাবর্ধক।

ভাঙ বীজের পুষ্টিগুণ পোস্তর তুলনায় কিছু কম নয়। বরং বেশি। প্রোটিন, ফাইবার, ওমেগা ৩ ও অন্যান্য ফ্যাটি অ্যাসিড-সমৃদ্ধ ভাঙ বীজ হৃদয়-অনুকূল। নানা রকম পদ হয় এই বীজ থেকে। উত্তরাখণ্ডে সহজলভ্য হলেও বাংলায় নয়, তবে অনলাইন পাওয়া যায়; সর্ষের দানার মতো দেখতে, দামও সাধ্যের মধ্যে। ভাঙ খেয়ে প্রসন্ন হয়েছিলেন কৌরবরত্ন দুর্যোধন। সেই প্রসন্নতার কথা ‘মহাসমর’ (লেখক নরেন্দ্র কোহলি) গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। হর-কি-দুন উপত্যকায় ‘তমস’ নামে একটি নদী আছে। দুর্যোধনের মহাপ্রয়াণের পর তাঁর প্রজাদের অশ্রুজলে সেই নদীর সৃষ্টি বলে জানা যায়। উপত্যকার ‘ওসলা’ নামের একটি জায়গায় দুর্যোধনের মন্দির আছে, সেখানে তিনি শিবের অবতার রূপে পূজিত হন। শুধু ওসলা নয়, উত্তরকাশীর জখোল গ্রামেও দুর্যোধন-মন্দির রয়েছে। রয়েছে দক্ষিণ ভারতেও—‘মালানাড়া দুর্যোধন মন্দির’ কেরলের কোল্লাম জেলার আলমাকাডাবু গ্রামে অবস্থিত। কেরলে দুর্যোধন পান করেছিলেন todi বা তাড়ি আর উত্তরাখণ্ডে ভাঙ-কা-পানি। তবে ভাঙের সূত্রে দুর্যোধনের সঙ্গে শিবের অনুষঙ্গ ভাবলে ভুল হবে, অন্য মহাকাব্যের আর এক প্রতিনায়ক রাবণের সঙ্গেও শিবের যোগাযোগ নিবিড়। মহাভারতে অবশ্য অশ্বত্থামাকে শিবের অংশাবতার বলে স্বীকার করা হয়েছে। তিনিও নেশাভাঙ করতেন (করেন বলা উচিত, কেননা তিনি চিরজীবী, থাকেন জঙ্গলে)। ফ্লিট নামের এক সাহেব দেখিয়েছেন-- দুর্যোধনের মামাতো ভাই, শকুনিপুত্র ঊলূক হলেন মহর্ষি কণাদ, যিনি শিবের আদেশে বৈশেষিক দর্শন প্রণয়ন করেন। কণাদ মুনি পরমাণুবাদ দিয়ে জগতের ব্যাখ্যা করেছিলেন। পরমাণু নিত্য বলায় তাঁকে নাস্তিক, অবৈদিক প্রভৃতি ‘নিন্দা’ শুনতে হয়েছে।

অনিত্য এই জগতে (পড়ুন, ভারতে) উৎসবের দিন ভাঙ খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। দুধ বা লস্যির সঙ্গে মিশিয়ে তা খাওয়া হয়। এবং ঘোর পিতৃতান্ত্রিক পরিবারেও ঘোমটা নামক হিজাব-পরা মহিলারা পুরুষদের সঙ্গে সেই নেশা করে থাকেন, অন্য নেশাদ্রব্যের ক্ষেত্রে যা সচরাচর ঘটে না। ভাঙের বীজ কিন্তু নেশার বস্তু নয়, তা দিয়ে ভাল চাটনি করা যায়।

কী কী লাগবে?

১। ভাঙ বীজ—৫০ গ্রাম

২। কাঁচা লঙ্কা—২টো

৩। পাতিলেবুর রস—৩ বড় চামচ

৪। পুদিনা পাতা—২ বড় চামচ (বেটে নেওয়া)

৫। জল—৩ বড় চামচ

৬। নুন—১/২ ছোটো চামচ

ভাঙের বীজ স্বর্গীয়। মনে করা হয়, কৈলাস থেকে শিব এই বীজ জগতে কল্যাণের উদ্দেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। জর্জ ওয়াশিংটন বলেছিলেন, ভারতীয় Hemp Seed যত পারো ছড়িয়ে দাও এবং সর্বত্র সেই গাছের চাষ করো। জামাইকান সিঙ্গার বব মার্লেও ভাঙের ভক্ত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভাঙ হল জাতির উপশম, আর অ্যালকোহল হল ধ্বংস। বেদে ভাঙের কথা আছে। সংস্কৃত শব্দ ‘ভঙ্গা’। অথর্ব বেদে ভঙ্গা হল পাঁচ পবিত্র জাগতিক গাছের একটি। এর পাতায় পাতায় থাকেন একজন দেবদূত। আনন্দের, মুক্তির উৎস হল ভঙ্গা। পুরাণে নানা গল্প আছে ভাঙ নিয়ে। সমুদ্র মন্থনে যে অমৃত ওঠে, তা স্বর্গে নিয়ে যাওয়ার পথে মর্ত্যে যত্র যত্র তার ছিঁটেফোঁটা পড়েছিল সেখানে সেখানে গজিয়ে ওঠে ভাঙ গাছ। আর একটি কাহিনি অনুসারে, সমুদ্র মন্থনের সময় শিব তাঁর কন্ঠে গরল ধারণ করেছিলেন। তীব্র যন্ত্রণায় যখন নীলকন্ঠ কাতরাচ্ছেন, তখন পার্বতী তাঁকে ভঙ্গা এনে দেন। শিবের যন্ত্রণার উপশম হয়। বাবা মহাদেবের পূজায় তাই ভোগ হিসাবে ভাঙ দিতেই হয়। সুশ্রুত-সংহিতায় ভাঙের নানা গুণাগুন কীর্তিত হয়েছে। এটি যেমন পেট পরিষ্কারের কাজে লাগে তেমনি, স্নায়ুর অসুখেও ফলদায়ী। মৃগী থেকে অবসাদ, ভঙ্গার জুড়ি মেলা ভার। বিদেশিদের অনেকেই ভাঙকে পেনিসিলিনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। মহেশ্বর ছাড়া বিষ্ণুও ভঙ্গাভক্ত ছিলেন, যাঁর সম্পর্কে মার্কস সাহেব দাস ক্যাপিটালে লিখেছেন, Vishnu, the capitalist (Capital, 1:597)। স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোপীদের সঙ্গে বৃন্দাবনের ভঙ্গাবনে নৃত্যলীলা করেছেন। ক্যাপ্টেন অজিত বড়কাইল জানিয়েছেন, শ্রীকৃষ্ণ বাল্যকাল থেকে ‘তোফু’ নামক দধির সঙ্গে ভাঙ মিশিয়ে খেতেন। দোলের উৎসবে তাই ভাঙের শরবত পান করার রেওয়াজ।

তবে ভাঙ বীজ খেলে নেশা হয় না। মনে একটা প্রসন্নতা আসে। ভাল ঘুম হয়। ভাঙের চাটনি বানানোর আগে উপকরণ গোছাতে সময় লাগে ৫ মিনিট, তৈরি করতে ১০ মিনিট। মোট ১৫ মিনিট। বানানোর মধ্যে কোনও জটিলতা নেই, অতীব সহজ।

দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুঁ-র জীবন খুব সহজ পথে চলেনি। আফগানিস্তানে অনেক দিন লুকিয়ে ছিলেন। জীবনের নানা ওঠাপড়ার পর অবশেষে গ্রন্থাগারের সিঁড়ি থেকে পতন হয় তাঁর, ইন্তেকালও। তিনি ভাঙ ভালবাসতেন। হেকিমদের পরামর্শে নিয়মিত খেতেন। মুঘল সৈনিকরা যুদ্ধক্ষেত্রের ছাউনিতে অবসাদ কাটাতে ব্যবহার করতেন ভঙ্গা বা সিদ্ধি। ভাঙকে বাংলায় ‘সিদ্ধি’ বলে। একটা সময়ে মিশরের ফাঁরাওদের সিদ্ধি পাঠাতেন কেরলের নাবিকরা। গার্সিয়া দা ওর্টা নামের একজন পর্তুগিজ ইহুদি চিকিৎসক তাঁর ভারত-স্মৃতিকথায় (১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দ) ভাঙের ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। গুজরাতের সুলতান ‘বাহাদূর শাহ’ প্রমোদ উপকরণ হিসাবে ভাঙ খেতেন। গার্সিয়া বলেছেন, ইউরোপের hemp plant আর ভারতীয় ভাঙ ভিন্ন। সিপাহী বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক মঙ্গল পাণ্ডে তাঁর জবানবন্দিতে বলেছিলেন, আসলে তিনি তলোয়ার চালাতে চাননি, ভাঙ খাওয়ার জন্য ওর’ম হয়ে গেসিল। ব্যারাকপুরে তখন ভাঙের জোগান ছিল ভালোই।

ভাঙ তাহলে দ্রোহ-বিপ্লবের জন্মও দেয়। কেমন সেই দ্রোহ বা বিপ্লব? সংস্কৃত ‘ভঙ্গা’ কথাটি এসেছে ‘ভ-ন্-জ্’ নামক ধাতু থেকে, যার অর্থ হল আমর্দন, যা জট পাকানোকে খুলে দেয়। আবার বাংলা ‘সিদ্ধি’ এসেছে ‘সিধ্’ ধাতু থেকে, যার মানে মনু বলেছেন নিবৃত্তি। হরিচরণ অনেক অর্থের মধ্যে ঋদ্ধি, ওষধি ও দুর্গাকে রেখেছেন, যে উমা নীলকন্ঠের যন্ত্রণা মোচন করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঋদ্ধি ও সিদ্ধি ছিলেন সম্পদের দেবতা কুবেরের দুই স্ত্রী, সম্পদের দেবতার কাছ থেকে তাঁদের কেড়ে আনেন গণেশ এবং নিজের জায়া হিসাবে গণ্য করেন। জনগণেশের এ হেন ব্যবহার হোক কিংবা বিপ্লব বা বিদ্রোহ, “সিদ্ধি ছাড়া কোন কার্য্য সিদ্ধ নাহি হয়” (দুর্গাপঞ্চরাত্রি—কাশীবিলাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশিত)। ভারতচন্দ্র লিখছেন, “সিদ্ধিতে মগন বুদ্ধি শুদ্ধি হৈল ভুল।” সাফল্যে মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম আর কি! ইন্দ্রপ্রস্থে ব্যক্তিমানুষের ঐশ্বর্য বা ‘সাফল্য’ দেখে দুর্যোধনের মাথা ঘুরে গিয়েছিল। তিনি আবার ডাকলেন দ্যূতের নেশায় আচ্ছন্ন যুধিষ্ঠিরকে, এবং পরাজিত করলেন। বারো বছর বনবাস আর এক বছরের অজ্ঞাতবাস হল পাণ্ডবদের।

অজ্ঞাতবাসের সময় পাণ্ডবদের খুঁজতে বেরিয়েছিলেন কুরুবীরেরা। দুর্যোধন এসেছিলেন ‘হর কি দুন’ উপত্যকায়। সেখানে জলতেষ্টায় কাতর হলে একজন শূদ্রা রমণী তাঁকে ‘পানি’ দেন। ইতস্তত করেছিলেন দিতে, কিন্তু কুরুরাজের অভয় পেয়ে জলদা হলেন সেই রমণী। প্রসন্ন দুর্যোধন তাঁদের প্রচুর নিষ্কর জমি দিলেন। ওসলা এবং জখোল গ্রামে, এমনকি কেরলের কোল্লামেও মোটামুটি একই কাহিনি প্রচলিত। এই সব জমিতেই গড়ে ওঠে মন্দির, আজও সেই সব জমি রাজেন্দ্র দুর্যোধনের নামে, নিষ্কর—প্রজারা ব্যবহার করেন।

পাণ্ডবদের মাত্র পাঁচটি গ্রাম দিয়ে দিলে মহারণ হত না। কিন্তু ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’ কেন বলেছিলেন দুর্যোধন? মহাভারতে তাঁর প্রজারঞ্জক হিসাবে এত সুখ্যাতি আছে (সৌপ্তিক ৯/৩৫-৩৭, আশ্রমবাসিক ১০/১৬) যে মহান নৃপতিরাও লজ্জা পাবেন, তাহলে? সেই প্রশ্নের উত্তর জটিল ও দীর্ঘ । অবশেষে দুর্যোধনের পতন হয়েছিল-- যেমন পুঁজিবাদ দখল করে নেয় সব কিছু, ঠিক তেমন করেই। শেষমেশ ঊরুভঙ্গ করা হল তাঁর। পেরেস্ত্রৈকার সামান্য তুলনা চলতেও পারে। ঊরু ছিল কুরুসূর্যের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা—অ্যাকিলিস’ হিল। ‘ঊরু’-র পচতি (to cook) বা root হল ‘ঊর্ণু’ যার অর্থ হল আচ্ছাদন। খুলে গেল আগল এবং মুক্ত হল ধর্ম (মতিলাল বলবেন morality) এবং চার বিদ্যা—বিশেষ করে বার্ত্তা (economics) ও দণ্ডনীতি (politics)। রাজনীতি পরম শিল্প, সে নীতিশাস্ত্র ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। অর্জুন বললেন, ধর্মের পর অর্থ নয়-- অর্থের পর ধর্ম নামক পুরুষার্থ আসা উচিত। দুর্যোধন ‘ভঙ্গ ঊরু’ নিয়ে প্রয়াত হলেন। ধৃত রাষ্ট্রের ‘ঊর্ণু’ বা আচ্ছাদন চলে গেল, নগ্ন হয়ে পড়ল।

‘ঊর্ণায়ু’, ‘ঊর্ণনাভ” সব শব্দেরই ধাতু ‘ঊর্ণু’। ঊর্ণায়ু হল ক্ষণভঙ্গ (মেদিনী)—আদিপর্বের নগ্ন ক্ষপণক বা তক্ষককে মনে করুন, যিনি পরীক্ষিৎকে নিকেশ করলেন, মহাভারতের টীকাকার নীলকন্ঠের মতে তিনিই পাষণ্ড বা বৌদ্ধ ভিক্ষু। ঊর্ণনাভ বা মাকড়সার নাভিতে ঊর্ণা (আচ্ছাদনসাধন) আছে। দুর্যোধন ছিলেন সকলের রাজা। তাঁর বার্ত্তা ও দণ্ডনীতি ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ভাঙের চাটনি বিষয়ক আলোচনায় সেই তত্ত্বসমূহের বিস্তৃতি ধান ভানতে শিবের গীত। আপাতত এটুকু, ‘ধৃত রাষ্ট্র’ মানে সম্যক ভাবে জনগণের জন্য ‘ধৃত’ বার্ত্তা ও দণ্ডনীতি।

জনগণ কিন্তু চাটনি খেতে ভালবাসেন। সেই লেহ্যপ্রকরণম্ এই বার—

প্রথমেই ভাঙ বীজ সেঁকে মানে রোস্ট করে পিষে নিতে হবে। তার সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা, লেবুর রস, পুদিনা পাতা, জল ও নুন মিশিয়ে মিক্সিতে ঘুরিয়ে নিন। চাটনি রেডি। কঠিন বিকল্পের পরিশ্রম নেই, কবি (শঙ্খ ঘোষ) তো বলেই রেখেছেন।

কবি রবীন্দ্রনাথের ঠাকুর্দা দ্বারকানাথ ১৯৩৮ সালে বৃন্দাবনে বেড়াতে গিয়ে দশ হাজার টাকা খরচ চৌবেদের একটি ভোজ দিয়েছিলেন। এক-একজন চৌবে ব্রাহ্মণ নাকি তিন চার সের করে পুরি ও মিষ্টি খেয়েছিলেন। জানা গিয়েছিল, প্রত্যেকেই লোটা ভরে ভাঙ এনে ভোজনের পূর্বে সেবন করেন। ভাঙ এমনিতে শস্তার বস্তু। যে সব অঞ্চলে এর গাছ জন্মে, সেখানে আগে মুফতে পাওয়া যেত। সেই জন্য বোধ হয় এমন প্রবাদের জন্ম—‘ঘরে নাই ভূজল ভাঙ/ ব্যাটার নাম দুর্গারাম’। আরেকটি প্রবাদও শোনা যায়—‘শুদ্দোর গুরু বাওন, বদ্দির গুরু ভাঙ’। ভাঙের ওষধিগুণের কথা বিবেচনা করে বোধ হয় প্রবাদটির শেষ অংশ রচিত। বৈদ্যরা রুগিকে অনেক সময় তেঁতুল বা ইমলিতে ভাঙ মিশিয়ে খেতে বলেন। উত্তর ভারতের বহু জায়গায় প্রত্যেক সন্ধ্যায় এই ভাঙমিশ্রিত তেঁতুলজল খাওয়ার প্রচলন আছে। ‘ইমলি’ বলেই ডাকা হয় ওই নেশার পানীয়কে। বাবা শিবকে প্রণাম জানিয়ে সেবন করা হয়।

বালক গদাধর ছেলেবেলায় শিব সেজে অভিনয় করতেন। গদাধর শ্রীরামকৃষ্ণের পূর্বনাম। অবতারবরিষ্ঠ রামকৃষ্ণ প্রবাদ বলেছেন,

গৃহী হোকে বাতায় জ্ঞান

ইমলি পিকে করে ধ্যান

যোগী হোকে ঠোকে ভগ

এ তিন আদমি কলি কা ঠগ।

ঠাকুরের কথা মেনে ‘ইমলি’ বা ভাঙফুল/পাতা খাব না, বরং সবুজ পাতার ফিরোজিয়া ঝিঙে ফুল দেখব, দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পাবে। তবে ভাঙের বীজ খেতে মানা নেই। তা হল স্বর্গের বীজ, অমৃতের ফোঁটা, বাবা নীলকণ্ঠকে দেওয়া হৈমবতীর প্রসাদ।

পুনশ্চ ১

শিরোনামে উল্লিখিত ‘রাগ দরবারি’ শ্রীলাল শুক্লার লেখা একটি বিদ্রুপাত্মক উপন্যাস, যেখানে লেখক গত শতাব্দীর ষাটের দশকের উত্তরপ্রদেশের চিত্র এঁকেছেন—ভাঙ সেখানে সর্বব্যাপ্ত, এমনকি সেই সব শিবশিশু বাচ্চাদের মধ্যেও, যারা দুধের স্বাদ কেমন তাইই জানে না।

পুনশ্চ ২

শিবের অংশাবতার বালক-অশ্বত্থামাও জানতেন না দুধের স্বাদ। তিনি পিটুলিগোলা জলকে দুধ ভাবতেন। তাই নিয়ে অন্য বালকেরা ঠাট্টা করলে অশ্বত্থামার পিতা দ্রুপদের কাছে অর্থ চাইতে যান। দ্রুপদ তাঁকে অপমান করলে ভাঙের বীজের স্থলে মাটিতে ‘কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বীজ’ পড়ে।

0 Comments
Leave a reply